নবী সুলাইমান (আ.) একদিন তাঁর বিশাল বাহিনী নিয়ে এক উপত্যকা দিয়ে যাচ্ছিলেন। মানুষের পাশাপাশি জিন, পশুপাখি সবই ছিল সেই বাহিনীতে। হঠাৎ সুলাইমান (আ.) এক পিঁপড়ার আওয়াজ শুনতে পেলেন। সে তার স্বজাতিকে উদ্দেশ্যে করে বলছিল: ‘হে পিঁপড়ার দল! তোমরা নিজ নিজ গর্তে প্রবেশ করো, যাতে সুলাইমান ও তার বাহিনী অজ্ঞাতসারে তোমাদের পিষে না ফেলে।’ (সুরা নামল: ১৮) বিখ্যাত মুফাসসির আবদুর রহমান আস-সাদী (রহ.) এই আয়াতের তাফসিরে দুটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, হয়তো আল্লাহ তাআলা সেই একটি পিঁপড়াকেই এমন অলৌকিক আওয়াজ দিয়েছিলেন যা পুরো উপত্যকার পিঁপড়াদের কানে পৌঁছে গিয়েছিল। অথবা, সে তার কাছের পিঁপড়াদের খবরটি দেয় এবং মুহূর্তের মধ্যে সেই বার্তা গোটা পিঁপড়া সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ক্ষুদ্র প্রাণীর সতর্কতা ও নিজ জাতির প্রতি গভীর মমত্ববোধ দেখে সুলাইমান (আ.) মুচকি হাসলেন। বিজ্ঞ তাফসিরকারদের মতে, এটি ছিল একজন নবীর উন্নত শিষ্টাচারের প্রকাশ। নবীদের বিস্ময় বা আনন্দ অট্টহাসিতে রূপ নেয় না, বরং তা মৃদু হাসিতেই সীমাবদ্ধ থাকে যেমনটা দেখা যেত শেষ নবী হজরত মুহাম্মাদের (সা.) জীবনেও। পিঁপড়ার এই বিচক্ষণতায় আনন্দিত হয়ে সুলাইমান (আ.) তাঁর বাহিনীর গতিপথ বদলে দিলেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে দোয়া করলেন: ‘হে আমার রব! আমাকে সামর্থ্য দিন, যেন আমি আপনার সেই নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে পারি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন; আর যেন এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন। আর আপনার অনুগ্রহে আমাকে আপনার সৎকর্মশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ (সুরা নামল: ১৯) এই ঘটনাটি থেকে আমরা কী শিক্ষা পাই? তিন আয়াতের এই সংক্ষিপ্ত ঘটনাটির জন্য আল্লাহ তাআলা পুরো সুরাটির নামকরণ করেছেন ‘নামল’ অর্থাৎ পিঁপড়া। এই ঘটনাটি থেকে যে অমূল্য শিক্ষাগুলো আমরা পাই: ১. সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সতর্ক হতে হবে পিঁপড়াটি বহুদূর থেকেই বিপজ্জনক পরিস্থিতির আভাস পেয়েছিল। কোনো সংকট তৈরি হওয়ার আগেই তা অনুধাবন করতে পারা একজন প্রজ্ঞাবান নেতার প্রধান গুণ। সংকট সামলানোর চেয়ে সংকট তৈরি হতে না দেওয়াটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার প্ররিচায়ক। ২. আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তববাদী হতে হবে বিপদের আঁচ পেয়েই পিঁপড়াটি নিজের জাতিকে গর্তে ঢোকার নির্দেশ দিয়েছিল। সে কিন্তু সুলাইমানের (আ.) বাহিনীকে বিরক্ত করতে বলেনি। কারণ তাতে সুলাইমানের বাহিনী কিছুটা বিরক্ত হলেও পিঁপড়াদেরই ক্ষতি হতো বেশি। ৩. দ্রুত বার্তা পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি বিপদের তথ্য কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সে দ্রুত তা পুরো জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। যে কোনো দল বা সমাজ পরিচালনায় তথ্য সঠিক সময়ে পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। ৪. অন্যকে অহেতুক দোষারোপ করে লাভ নেই পিঁপড়াটি কিন্তু সুলাইমান (আ.) ও তাঁর বাহিনীকে হিংস্র বা অত্যাচারী বলে গালি দেয়নি। বরং তাদের প্রতি সুবিচার করে বলেছিল, ‘তারা না জেনে বা না বুঝে তোমাদের পিষে ফেলতে পারে’। ৫. স্বার্থপর না হওয়া পিঁপড়াটি চাইলে শুধু নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে গর্তে লুকিয়ে পড়তে পারতো। কিন্তু সে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে আগে গোটা জাতিকে সতর্ক করেছিল। ৬. আত্মম্ভরিতা পরিহার করে নিজের দায়িত্ব পালন করা বিপদের মুহূর্তে নিজের নাম জাহির করা বা বাহবা কুড়ানোর কোনো চেষ্টা সেই পিঁপড়াটির মধ্যে ছিল না। সে শুধু কাজটুকুই করে গেছে নিরবে। ওএফএফ

Source: JagoNews24